
এম আব্দুল করিম, সিলেট:
হযরত শাহজালাল রহঃ ও ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতি বিজড়িত আধ্যান্তিক নগরীখ্যাত সিলেটে ‘মারকাযুল কোরআন মাদ্রাসা’ নামের কোমলমতি নিষ্পাপ মাদ্রাসা ছাত্রদের এতিম বানিয়ে দেশ এবং প্রবাসে চলছে রমরমা চাঁদা বানিজ্য। গরীব, মিছকিন ও এতিম ছাত্রদের লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থার কথা বলে মারকাযুল কোরআন মাদ্রাসার মুহতামিম হাফিজ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সমাজের বিত্তশালী থেকে শুরু করে সিলেটের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার দোকানে দোকানে রশিদ বই ও কুপনের মাধ্যমে চলছে চাঁদা আদায় এবং ফান্ড কালেকশন। মাদ্রাসার এতিম ছাত্রদের নামে আদায়কৃত লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে নিজের ও পরিবারের ভোগবিলাসী জীবন যাপনের অভিযোগ উঠেছে স্বয়ং মুহতামিম হাফিজ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে প্রাপ্ত অভিযোগ ও উক্ত মাদ্রাসার বর্তমান ও প্রাক্তন একাধিক শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিবাদকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে,মারকাযুল কোরআন মাদ্রাসার মুহতামিম হাফিজ মুজিবুর রহমান মাদ্রাসার নাম নিয়ে পবিত্র ধর্মকে পুঁজি বানিয়ে কোমলমতি নিষ্পাপ শিশু ছাত্রদের এতিম সাজিয়ে ফান্ড কালেকশনের নামে নিজের পকেট ভারি করে হাতিয়ে নিয়েছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। মাদ্রাসার ফান্ডে ধর্মপ্রাণ মানুষের দানকরা নগদ টাকা,স্বর্ন,গরু-ছাগল বিক্রি করে নিজের ছেলে ও আপন ভাইকে বিদেশে পাঠানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাছাড়া নিজের গ্রামের বাড়িতে ৫ কেদার জমিও নাকি তিনি কিনেছেন এই মাদ্রাসার টাকা দিয়ে। এমনকি মাদ্রাসায় ব্যবহারের জন্য দান পাওয়া আসবাবপত্র তিনি নিজের বাসায় নিয়ে সেগুলি নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন বলে জানা যায়।
এছাড়াও কোমলমতি শিশু ছাত্রদের দ্বারা প্রায়শই তিনি শারীরিক সেবা নিয়ে থাকেন এবং কোন কারণ ছাড়াই ছাত্রদের গালিগালাজ ও বেত্রাঘাত করার অভিযোগ উঠেছে মুহতামিম মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। উনার এমন আচরণের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তাদের বাচ্চাদের এই মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম ও দূর্নীতির খবর পেয়ে এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকের একটি টিম গত ৫ আগস্ট ২০২৩ ইং তারিখে সরেজমিনে সিলেট নগরীর দপ্তরি পাড়া পয়েন্ট সংলগ্ন মারকাযুল কোরআন মাদ্রাসায় উপস্থিত হলে সেখানে অভিযুক্ত মুহতামিম মুজিবুর রহমানকে পাওয়া যায়নি,মাদ্রাসার অন্যান্ন শিক্ষকদের এসব অনিয়ম ও দূর্নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করলে উনারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন “আসলে আমরা এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবোনা,আমাদের সমস্যা হবে, আপনারা মুহতামিম সাহেবের মোবাইলে কথা বলেন,কিন্তু উনার মোবাইলে বার বার কল দিলও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে উক্ত মাদ্রাসার নাজিম মাওলানা ছদরুল আমিন জানান এই মাদ্রাসায় বর্তমানে শিক্ষক ৫ জন এবং আবাসিক/অনাবাসিক মিলিয়ে ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৪০ জন।অনেক ছাত্র মাদ্রাসা ছেড়ে চলে গেছে,এসব কারণ মুহতামিম সাহেব ই ভালো করে বলতে পারবেন এর বেশি কিছু আমরা জানি না।
পরদিন অভিযুক্ত মুজিবুর রহমান এই প্রতিবেদকের মোবাইলে নিজেকে মারকাযুল কোরআন মাদ্রাসার মুহতামিম পরিচয় দিয়ে কথা বলেন এবং জানান যে তিনি অসুস্থ,চোখের অপারেশন হয়েছে সাতদিন পরে দেখা করে বিস্তারিত বলবেন। গরীব ও এতিম ছাত্রদের নামে মাদ্রাসার নগদ টাকা আত্মসাৎ, মানুষের দান করা ৫ ভরি স্বর্ণ ও গরুছাগল বিক্রির সম্পূর্ণ টাকা আপনি নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করেছেন, তাছাড়া এই মাদ্রাসা কি আসলেই এতিমখানা মাদ্রাসা? বর্তমানে আপনার মাদ্রাসায় এতিম ছাত্রদের সংখ্যা কতো? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তিনি হতভম্ব হয়ে বলেন সবগুলো অভিযোগ সত্য নয়,আগে কিছু এতিম ছাত্র ছিলো তাছাড়া আমাদের পরিচালনা কমিটি এবং সুরাবোর্ড আছে, আমার মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষক ও কয়েকজন ছাত্র আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছে আপনারা এক সপ্তাহ পরে আসলে আমি বিস্তারিত সবকিছু বলবো এই বলে ফোনের লাইন কেটে দেন।
এতিমখানার নাম নিয়ে চাঁদা বাজিসহ দানখয়রাতের টাকা আত্মসাৎ এবং ছাত্রদের এতিম বানিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপনের বিষয়ে জানতে স্থানীয় সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এস এম শওকত আমিন তৌহিদের অফিসে গেলে তিনি বলেন, আমার অফিসের সামনেই এই মাদ্রাসা এবং গতবছর ওয়াজের সময় আমি ১০ বস্তা চাল দান করেছিলাম কিন্তু পরে জানতে পারলাম মুহতামিম হাফিজ মুজিবুর রহমান নিজেই এতিমখানা বলে ছাত্রদের দিয়ে টাকা তুলেন এবং সবকিছু আত্মসাৎ করেছেন এবং মাদ্রাসায় কোন পরিচালনা কমিটিও নেই, মুহতামিম ই সবকিছু এরপর থেকে আর কোন খবর রাখিনা, আপনারা আশপাশের লোকজনকে বিষয়টি জিগ্যেস করলে আরো অনেককিছু জানতে পারবেন।
এদিকে রায়নগর এলাকার প্রত্যয় ৬৩ নং বাসার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে জানান যে, আমার তিনজন ছেলে (শাকিব ১০ পারা হিফয, শাকিল, রাফি) এই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতো, দুইজন আবাসিকে থাকতো এবং প্রতিমাসে খরচবাবত তিন হাজার টাকা দিতাম এবং চারবছর ছিলো কিন্তু পরে যখন জানতে পারলাম মুহতামিম মুজিবুর রহমান আমার ছেলেদের সাথে নিয়ে এতিম বানিয়ে এতিমখানার নাম করে চাঁদা আদায় করছেন যা কোনভাবেই ঠিক নয়, তখন আমি আমার বাচ্চাদের এই মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাই,আপনারা সাংবাদিক, আপনাদেরকে জাতির বিবেক বলা হয়, দয়া করে এই লেবাসধারী ধর্মব্যবসায়ীর মুখোশ উন্মোচন করুন।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ/ আমিন উদ্দিন
