
ওয়েছ খছরু :সিলেটের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান কি আগেই জানতেন সে খবর। নাকি ভোটের মাঠে নজর কাড়তে কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কোনটা সঠিক? মেয়র আনোয়ার বলেছিলেন, শফিকুর রহমান চৌধুরী এমপি হলে মন্ত্রীও হবেন। ওসমানীনগরের তাজপুরে নৌকার সমর্থনে সর্বশেষ জনসভায়ও তিনি বক্তব্যের সময় সে কথা বলেছিলেন। মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর কথাই সত্য হলো। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। তবে মন্ত্রিসভা থেকে সিলেটবাসী এবার হারিয়েছে বাঘা বাঘা মন্ত্রিত্বের পদও। বাদ পড়লেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইমরান আহমদ, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন। হবিগঞ্জের ব্যারিস্টার সুমনের কাছে পরাজিত হয়ে আগেই ছিটকে পড়েন বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী। সিলেটে এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্ত্রিত্ব পায়নি বলে হতাশা রয়েছে।
বাদপড়া মন্ত্রীরাও সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হচ্ছেন। তবে প্রতিমন্ত্রিত্ব পাওয়া শফিকুর রহমান চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। এবার বিশ্বনাথের দুই দু’জন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে নির্বাচিত এমপি হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন শফিকুর রহমান চৌধুরী। আর টেকনোক্রেট কৌটায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন ডা. সামন্ত লাল। তার পৈতৃক বাড়ি বিশ্বনাথে। শফিকুর রহমান চৌধুরী পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সিলেট ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এরপর তিনি পাড়ি জমান লন্ডনে। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির একজন দক্ষ সংগঠক ছিলেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক থাকার সময় ২০০৮ সালে হঠাৎ করেই সিলেট-২ আসনে আওয়ামী লীগের টিকিট পেয়ে যান তিনি। তখন ওই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ছিলেন সাবেক ছাত্রনেতা ও সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী। ওয়ান-ইলেভেন শাসনের সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে ইলিয়াস আলীকে পরাজিত করে এমপি হয়ে সবার নজর কাড়েন শফিক চৌধুরী। রাতারাতি পরিচিত হয়ে উঠেন সিলেটে। পরবর্তীতে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদেও তাকে আসীন করা হয়। ওই সময়ের জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাদরেল রাজনীতিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীমকে সরিয়ে দলের সর্বোচ্চ ফোরাম শফিক চৌধুরীকে ওই পদে বসান। দলের হাল ধরে সফল হন শফিক চৌধুরী। দল সচল রাখতে কাজ শুরু করেন সিলেটে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শফিক চৌধুরীর আসনটি শরিক দলকে ছাড় দেয়। ফলে শফিক চৌধুরী চলে যান সাইডলাইনে। তবে জেলার সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় তিনি রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় থাকেন। ২০১৮ সালেও জাতীয় নির্বাচনে একইভাবে শরিক দলকে দেয়া হয় এ আসনের মনোনয়ন। এতে আরও অপেক্ষা বাড়ে শফিক চৌধুরীর। ২০১৯ সালে সিলেট আওয়ামী লীগের সম্মেলনে তার দলীয় পদটিও চলে যায়। ফলে পুরোপুরি ব্যাকফুটে চলে যান শফিক চৌধুরী। তবে এমপিগিরি, রাজনীতি সবকিছু চলে গেলেও তিনি একদিনের জন্য নিজের এলাকা বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। যেখানেই তাকে ডাকা হয়েছে সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। না ডাকলেও গেছেন এলাকায়। ওই সময় সিলেট-২ আসনে নৌকার জন্য তার সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল সিলেটের মেয়র বর্তমান মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এমনকি এলাকায় দু’জনের আলাদা বলয় ছিল। দু’গ্রুপের বিভক্ত হওয়ায় সিলেট-২ আসনের রাজনীতি ঘোলাটে ছিল। ২০২৩ সালে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী সিলেটের মেয়র হওয়ার ডাক পেলে দু’জনের বিরোধের অবসান ঘটে এবং সিলেটের নির্বাচনে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির শীর্ষে থেকে কাজ করেন শফিক চৌধুরী। এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ হারানো শফিক চৌধুরীকে পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি চাইছিলেন দলের অনেকেই। ওখানে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তখনকার আওয়ামী লীগের সিলেটের এমপিরা। তারা চাইছিলেন এমপিদের মধ্য থেকে জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি করতে। এ ক্ষেত্রে শফিক চৌধুরীর সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিলেন সিলেট-৪ আসনের এমপি ও পরবর্তীতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হওয়া ইমরান আহমদ। এ নিয়ে দ্বিধায় ছিল সিলেট আওয়ামী লীগও। এই অবস্থায় মাঝখানে কিছুদিন শফিক চৌধুরী হতাশ হয়ে লন্ডনে চলে গিয়েছিলেন। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরপরই আবার দেশে ফিরে আসেন। দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে শফিক চৌধুরী হন সিনিয়র সহ-সভাপতি। পরবর্তীতে জেলার সভাপতি এডভোকেট লুৎফুর রহমান মৃত্যুবরণ করলে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন। ভারপ্রাপ্ত থাকাকালে দলীয় প্রধানের নির্দেশে সিলেটসহ সারা দেশের ভারপ্রাপ্তদের ভারমুক্ত করা হলে শফিক চৌধুরী জেলার পূর্ণাঙ্গ সভাপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এবারের সিলেট-২ আসনের নির্বাচন ছিল শফিকুর রহমান চৌধুরীর অস্তিত্বের লড়াই। সেই সঙ্গে এ আসনের আওয়ামী পরিবারেও একই লড়াই ছিল। দুইবার প্রতীক না পাওয়ায় হতাশায় ছিলেন সবাই। এ কারণে এবারের নির্বাচনে দলের পক্ষ থেকে সেই হতাশা ঘোচানো হয়। দশ বছর পর নৌকার প্রতীকের প্রার্থী হন শফিকুর রহমান চৌধুরী। আর নিজের এলাকা হওয়ায় শফিক চৌধুরীর পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েন মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হলেন শফিক চৌধুরী। কাঙ্ক্ষিত এমপি হওয়া পর্যন্ত তার লক্ষ্য স্থির ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই ডাক পান মন্ত্রিসভায়। সেটি তার জন্য আরও বড় পাওয়া। গতকাল প্রথম দিন অফিসও করেছেন তিনি। শফিকুর রহমান চৌধুরী মানবজমিনকে জানিয়েছেন, প্রাপ্তি শুধু আমার নয়, এটা সিলেট-২ আসনের জনগণের এবং আওয়ামী লীগের। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ফলাফলও। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। বলেন, এখন কাজ অনেক। দল, মন্ত্রণালয় ও নিজের আসন একইসঙ্গে চালাতে হবে। এটি অসম্ভব না। আশাকরি কাজের মাধ্যমে এর উত্তম প্রতিদান দেবো। এজন্য টিমওয়ার্কও চান।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ// শাকিব
