
এমএকে জিলানী :আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মানবাধিকার এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অব্যাহত চতুর্মুখী চাপে রয়েছে বাংলাদেশ। এই চাপের পেছনে কাজ করছে ভূ-রাজনীতি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের উত্থানে অস্থির অবস্থায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো বা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যাতে চীনের দিকে হেলে না পড়ে সেই নিশ্চয়তা চায় যুক্তরাষ্ট্র। এই কারণেই বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মানবাধিকার এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এত আগ্রহী।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই বিষয়ে তারা কমবেশি দুই বছর আগে থেকে কথা বলার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে তাদের দেশের নেতারা বাংলাদেশ সফর করছেন। গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র দেশের এলিট বাহিনী র্যাবের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তার পেছনেও একই কারণ ছিল। একই কারণে ২০২১ সালে এবং চলতি বছর অনুষ্ঠিত গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচন কেন্দ্র করে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছরের ২৪ মে মাসে বাংলাদেশের ওপর ভিসানীতি ঘোষণা করে এবং ২২ সেপ্টেম্বর ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণা দেয় দেশটি। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছোট একটি দল পাঠিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি আগাম মূল্যায়ন শেষে ঘোষণা দেয় যে, আগামী নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক পাঠাচ্ছে না। যা বাংলাদেশের ওপর আরও একটি চাপ হিসেবে কাজ করছে। নির্বাচন পরিস্থিতি আগাম মূল্যায়ন করতে এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দল বাংলাদেশে সক্রিয়। একই ইস্যুতে আগামী সপ্তাহে তাদের একজন উপ-সহকারী মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসছেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত লিন্ডা টমাস গ্রিনফিল্ডকে তাদের দেশের ১৪ মার্কিন কংগ্রেসম্যান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেপ বোরেল ফন্টেলেসকে তাদের জোটের ৬ সদস্য (এমইপি) এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এন্থনি এলবানেজের কাছে তাদের দেশের গ্রিন পার্টির ১১ জন
সিনেটর ও ৪ জন এমপি-এরা সবাই বাংলাদেশের নির্বাচন কেন্দ্র করে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন ইস্যুতে নিয়মিতভাবে বৈঠক করছেন। সর্বশেষ সুইডেনের রাষ্ট্রদূত এলেক্স বার্গ ভন লিন্ডে গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেন। এর আগে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দফতরের স্থায়ী আন্ডার সেক্রেটারি স্যার ফিলিপ বার্টন গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের মধ্যে পঞ্চম কৌশলগত সংলাপে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় বলে জানান।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মানবাধিকার এবং সর্বোপরি গণতন্ত্র নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের চতুর্মুখী অব্যাহত চাপের নেপথ্যে রয়েছে ভূ-রাজনীতি। মূলত বাংলাদেশে চীনের প্রভাব ঠেকাতে তারা এসব ইস্যুকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব কৌশল বাস্তবায়ন করতে চায়। বিশ^ নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে তারা চায় না যে চীন এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করুক বা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ বাস্তবায়ন করুক। বাংলাদেশ যে চীনের প্রতি হেলে পড়ছে না এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন আস্থা পাচ্ছে না। এ জন্যই বাংলাদেশের দুর্বলতা নিয়ে তারা একের পর এক চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গত সোমবার বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমরা যে উন্নয়ন করছি তা যেন চীনের প্রভাবে না হারাই সেদিকে নজর রাখতে হবে। চীনের প্রভাবে সামনের দিনে অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, যা আমাদের সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্বাধীনতা ও উন্মুক্ততার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ^াস করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এই অঞ্চলে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সমৃদ্ধির প্রচারেও বিশ্বাস করে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এই অঞ্চলে একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দিয়েছে। যা উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। কর্তৃত্ববাদী শক্তি আন্তর্জাতিক বিষয়ে মৌলিক নিয়ম পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। আমাদের অবশ্যই অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে এই সন্ধিক্ষণে আসতে হবে।
অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বুধবার বলেন, একজন বন্ধুরই আরেকজন বন্ধুর প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র) নিজেদের একদিকে বাংলাদেশের বন্ধু দাবি করে, অন্যদিকে তারা বাংলাদেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে ওই রাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর একতরফাভাবে ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করেছে। সামনে তারা বাংলাদেশের জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। চীন কখনো কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নাক গলায় না। বরঞ্চ চীন বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক খাতে সাফল্যের জন্য সহযোগিতা করতে চায়। চীন বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহযোগিতা করতে চায়। বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু কে? জনগণই তা বলবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভানের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। তখন তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছি যে আমাদের আদেশ-সতর্কতা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। চীনকে প্রতিহত করতে চাইলে টাকা-পয়সা নিয়ে আসতে হবে। জ্যাক সুলিভানকে টাকা-পয়সা নিয়ে আসতে বলেছি। আমাদের দেশের অনেক পণ্ডিতের মতে, বাংলাদেশ চীনের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ কখনো চীনের লেজুরবৃত্তি করে না। বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষা করে চলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. তানজিম উদ্দিন খান সময়ের আলোকে বলেন, মূল বিষয়টা হচ্ছে, আমাদের নির্বাচন ঘিরে পশ্চিমা বিশে^র যে আস্থাহীনতা তা আমাদের নিজেদেরই সৃষ্টি করা। তাদের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যে পরিবর্তন, চীনের উত্থান, ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ঠিক একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়ন এগুলোর জন্য দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব এখন ভিন্ন রকম। পশ্চিমাদের ভূ-রাজনীতির বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলে তাদের কাছে দক্ষিণ এশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার তাৎপর্য এখন বেশি। আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি খেয়াল করি যেমন শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ সে ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব স্বাচ্ছন্দ্যময় নয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যারা ক্ষমতায় আছে তাদের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সম্পর্ক যেভাবে নিবিড় হচ্ছে, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশে যেসব বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তাতে মনে হতে পারে যে পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ এখন চীন ও রাশিয়া বলয়ে অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতদের যে টুইট (রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরপর) তাতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বাংলাদেশ খুব স্পর্শকাতর অবস্থানে আছে। এই স্পর্শকাতর অবস্থানটা যুক্তরাষ্ট্র তার দখলে নিতে চায়। এই নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় হাতিয়ার হচ্ছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নির্বাচন। যুক্তরাষ্ট্র সব দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে না। কিন্তু যখন মনে করে যেকোনো দেশের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা তার অনুকূলে যাচ্ছে না, তখন যুক্তরাষ্ট্র ওই দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নির্বাচন নিয়ে কথা বলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই সময় ছাড়া কোনো সময়ই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনকে লক্ষ্যে পরিণত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বিশেষ করে চীনকে ঘিরে তাদের যে অস্থিরতা, দক্ষিণ এশিয়াতে চীনের সঙ্গে তাদের যে প্রতিযোগিতা সেখানে তারা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখন বাংলাদেশের যে সম্পর্ক তা আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিষয় না। এখন যদি বিএনপি ক্ষমতায় থাকত তা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে ব্যতিক্রম কিছু হতো না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে ভূ-রাজনীতির প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সফরের পেছনে কারণ হচ্ছে ওয়াশিংটন ভূ-রাজনীতিতে ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এর মূলে রয়েছে চীনকে ঠেকানো। তবে বাংলাদেশ এখনও ভূ-রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ/ আরওয়া
