
সিলেট আলাপ ডেস্ক :দিনদিন বাড়ছে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি।শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মাঝে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।আর এই ইন্টারনেট ব্যবহার করে যেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে তেমনি বিপদও ডেকে আনছে অনেকের জীবনে।বিশেষ করে শিশু ও তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে।
তবে এই পরিস্থিতিতে বেরিয়ে আসতে অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি সচেতন হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সন্তানকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। সন্তান কখন কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে চলছে সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।
হামজা রহমান।বয়স মাত্র ৪।বাবা প্রবাসে থাকেন।আর মা গৃহীন। ঘরের কাজ করতে গিয়ে ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন মা।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে প্রথমে মায়ের মোবাইল হাতে নিয়ে গেইম খেলা কিংবা ইউটিউবে গেইম বা কার্টুন দেখা।দিনের বেশিরভাগ সময় এভাবে কাটে হামজার।
হামজার মা সুলতানা বেগম জানান, বাবা প্রবাসে থাকায় ছেলের আবদার না করা যায় না।কিন্তু দিনদিন মোবাইলের প্রতি তার আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে। ঘরের কাজ করতে গেলে ছেলেকে খেলার সামগ্রী দিলেও বোঝ দিয়ে রাখা যায় না।কারণ গেইম খেলতে চায়।দিনের বেশিরভাগ সময় মোবাইল তার কাছেই থাকে।এখন তাকে পড়াতে বসাতে গেলেও ধমক দিয়ে পড়াতে হচ্ছে।বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকতে হয় সব-সময়।
শাহরিয়ার আলম পেশায় একজন ব্যবসায়ী। তিনি জানান, তার ছেলের আবদার রক্ষা করতে বাধ্য হয়ে মোবাইলে টম এন্ড জেরি বা মটুপাটলু দেখাতে হয়। সেই সাথে মোবাইলে রাখা গেইম আরিফকে এনে দিতে হয়। একটানা ঘণ্টা-দেড়ঘন্টা গেইম খেলে। বাবা চলে গেলে মায়ের সাথে কিছুটা সময় পড়ালেখা করে ফের বায়না ধরে মোবাইলের । একটা সময় মা বিরক্ত হয়ে মোবাইল দিয়ে দেন। এভাবে ধীরে ধীরে মোবাইলের প্রতি আসক্তি বাড়ছে এই ছোট শিশু।
শুধু গেইম কিংবা কাটুন দেখা নয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপে একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি যারা শেয়ার করেন এবং বন্ধুদের সমবেদনা জানিয়ে থাকেন। আবার অনেকেই বিভিন্ন ধরণের অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে সেগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সোস্যাল মিডিয়ায়। এতে করে অনেক তরুণ-তরুণী মগ্ন থাকছেন সেগুলোতে। কোনো কোনো সময় নেট সমস্যা বা কিছু সময়ের জন্য এসব মাধ্যম বন্ধ থাকলে হতাশায় রিঅ্যাকশ্যান দিয়ে পোস্ট দেন তাদেরকে মোটাদাগে আসক্ত বলা যায়!
ইন্টারনেট।যাকে একথায় বলা হয় বিশ্বগ্রাম।যোগাযোগের সবচেয়ে অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট। আর বর্তমান সময়ে এই ইন্টারনেটের প্রতি বাড়ছে আসক্তি ।বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মানব জীবনে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।এটি বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। কিন্তু এই আর্শীবাদ ততটাও অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময় এবং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে মানব জীবনে ইন্টারনেটের প্রভাব এখন এতটাই বেশি যে, শিশু থেকে তরুণদের মাঝে এখন তা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের কারণে ছেলেমেয়েরা পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। তারা সময় পেলেই এখন স্মার্ট মোবাইল,ল্যাপটপ ও কম্পিউটার নিয়ে সময় কাটাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের দুর্নিবার আকর্ষণে নানা রকমের ক্ষতির শিকারও হচ্ছে তারা। যার সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে এসেছে প্রাণঘাতী নানা গেম। এ ধরণের গেমস-এ আসক্ত হয়ে শিশু-কিশোর-তরুণরা বিভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছে। আর এতে নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। এ থেকে উত্তরণের জন্য সন্তানদের বেশি সময় দেয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তির ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সন্তানদের অবহিত করা এবং তাদের নিজেদেরকেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা।
এই বিষয়ে কথা হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ ও স্নায়ু বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা.কাওসার আহমদের সাথে।
তিনি জানান, মোবাইলের রেডিয়েশনের ফলে খুব কম রোগী পাওয়া যায়। তবে এর প্রভাবটা খুবই মারাত্মক। তবে দীর্ঘসময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে আমাদের ব্রেইনে সমস্যা দেখা দিতে পারে ।তাই দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে । আর বাবা- মা সব সময় একটা নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহার করতে দিতে পারেন।
এক প্রশ্নের জবাবে কাওসার আহমদ বলেন, শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে নয় এই বিষয়টি নয়। সবাইকে এই বিষয়টি মেনে চলতে হবে।আমরা অনেক সময় দেখেছি ইন্টারনেটে আসক্ত ব্যক্তিরা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন, একাকীত্ববোধ করেন এবং তাদের মধ্যে একধরণের হতাশা কাজ করে। এর কারণ হচ্ছে আমাদের বুঝতে পারার অভাব তাই অভিভাবকরা এই বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা সাধারণত কৌতূহলী হয়।এ বয়সে তাদের মনে অনেক প্রশ্ন এসে ভিড় করে। তরুণ-তরুণীদের জীবনের এই জটিল স্তরে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং আদর্শ পিতা-মাতা ও শিক্ষকের দিকনির্দেশনা জরুরি।এ সময় তরুণ-মনে নানা ভাবের আদান-প্রদান হয়। তার মানসিক বিকাশ ঘটে। তাই প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকে বিরত থাকাটাই উত্তম বলে এই বিশেষজ্ঞ জানান।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ/ সাকিব
