
পঙ্কজ দে :দূরে মেঘালয় পাহাড় যেন হাওরে এসে মিশে গেছে। মাথার ওপর উড়ছে নানা জাতের পাখি। পানির নিচে থেকে উঁকি দিচ্ছে সবুজ জলজ জংলা। বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে অথৈ পানি। তার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে হাউসবোট। বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরাঞ্চলে আসা পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এই হাউসবোটে ভ্রমণ।
চার-পাঁচ বছর আগেও টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে ক্লান্ত হয়ে ফিরতেন পর্যটকরা। গাড়ি, মোটরসাইকেল, পায়ে হাঁটা পথ আর শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী ইঞ্জিন নৌকাই ছিল হাওর ঘুরে দেখার মাধ্যম। সেখানে স্বপ্নিল পরিবর্তন এনেছে হাউসবোটগুলো। টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন এমন বোট আছে ২০০টির মতো।
স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, আলাদা আলাদা প্রাইভেট কেবিন, বাথরুম, ব্যালকনি, লাউঞ্জ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ আধুনিক নানা সুযোগ-সুবিধা। বোটে থাকা স্টাফরা পর্যটকদের সার্বিক সেবা দিয়ে থাকেন।
অত্যাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন হাউসবোটে খাওয়াদাওয়াসহ প্যাকেজ ব্যয় সাড়ে সাত থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা। এই প্যাকেজের আওতায় টাঙ্গুয়ার হাওর, হাওরের ওয়াচ টাওয়ার, শহীদ সিরাজ লেক, টেকেরঘাট, বারেকের টিলা, জয়নাল আবেদীনের বিখ্যাত শিমুল বাগান, যাদুকাটা নদী ও লাকমাছড়া ভ্রমণ করা যায়। শুক্রবার কিছুটা বাড়তি টাকা ব্যয় করতে হয় পর্যটকদের।
হাউসবোটে করে হাওর ঘুরে দেখা পর্যটক দম্পতি সুমিত ও নিবেদিতা জানান, দারুণ দুটো দিন কাটিয়েছেন তারা। জেনারেটরের ব্যবস্থা ছিল নৌকায়, ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও মিলেছে বেশির ভাগ এলাকায়। নিরাপত্তা আর থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা থাকায় কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। পুরো সময় ভালোই উপভোগ করেছেন সন্তানসহ হাওরে বেড়াতে আসা এই প্রবাসী দম্পতি।
টাঙ্গুয়ার হাওর হাউসবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসুকুর রহমান জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে চাইলে এখন সুনামগঞ্জ শহর থেকেই হাউসবোটে উঠতে পারবেন পর্যটকরা। শহরের মল্লিকপুরে মুজিব পার্কের পাশে ২০ জুলাই থেকে চালু করা হয়েছে হাউসবোট ঘাট।
মাসুকুর রহমান আরও জানান, মল্লিকপুরের ঘাটটিকে পর্যটন ঘাটের পরিচিতি দিতে চান তারা। ওখানে ট্যুরিজম বোর্ড থেকেও কিছু ফান্ড দেওয়া হবে। দেড়শ থেকে দুইশ ফুট লম্বা জেটি দেওয়া হবে। অ্যাসোসিয়েশনের সুনামগঞ্জের প্রধান কার্যালয়ও হবে সেখানে। নিশ্চিত করা হবে নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ যাবতীয় সেবা।
অ্যাসোসিয়েশনের সংগঠক ইখতিয়ার উদ্দিন জানান, আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরে যেসব পর্যটক আসেন, তাদের বেশির ভাগেরই হাউসবোটে থাকা বা হাউসবোট নিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে। হাওরের পরিবেশ যাতে পর্যটকের উপস্থিতির কারণে বিনষ্ট না হয় সেজন্য ওয়ান টাইম প্লাস্টিকের গ্লাস, কাপ বা প্লেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবহারের কোনো কিছু হাওরে ফেলা যাবে না।
ইখতিয়ার উদ্দিন আরও জানান, একসঙ্গে ২০০ বোট যাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য শিডিউল করে দেওয়া হচ্ছে, যাতে কিছু হাউসবোট টাঙ্গুয়ায় থাকা অবস্থায় আরও কিছু হাউসবোট যাদুকাটায় বা টেকেরঘাটে থাকে। সর্বাবস্থায় টাঙ্গুয়ার পরিবেশ-প্রতিবেশের যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী জানান, টাঙ্গুয়ার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ঠিক রেখে হাউসবোটগুলোর চলাচল উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দিতে কাজ করা হচ্ছে। এজন্য পর্যটন মৌসুমে টেকেরঘাটের কাছাকাছি এলাকায় একটি ঘাট করা হচ্ছে। সুনামগঞ্জের ঘাটের সিদ্ধান্ত হয়েছে মল্লিকপুরে। এই ঘাটে অত্যাধুনিক ওয়াশব্লক ও জেটি থাকবে।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ/ সাকিব
