
সিলেট আলাপ ডেস্ক :রোববার বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। অথচ একসময় এই মেসিকেই নিজেদের লাল জার্সিতে দেখতে মরিয়া ছিল স্পেন।
শুধু চাওয়াই নয়, তাকে দলে ভেড়াতে নানা চেষ্টাও করেছিল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) দ্রুত পদক্ষেপেই বদলে যায় ইতিহাস।
১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়ায় যোগ দিতে আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান মেসি। তাই নিজের দেশেই তখন তিনি প্রায় অপরিচিত! কিন্তু বার্সেলোনার একাডেমিতে তার অসাধারণ প্রতিভা খুব দ্রুতই নজর কেড়েছিল স্প্যানিশদের।
তারা বুঝে গিয়েছিল, ভবিষ্যতের এক মহাতারকা তাদের হাতের কাছেই বেড়ে উঠছেন।
আর্জেন্টাইন সাংবাদিক এবং ‘মেসি: এল জেনিও কমপ্লেতো’ বইয়ের লেখক এরিয়েল সেনোসিয়াইনের ভাষ্য, সেই কারণেই মেসিকে স্পেনের জাতীয় দলে খেলানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছিল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন।
তবে মেসির অবস্থান শুরু থেকেই ছিল একেবারে স্পষ্ট, ‘স্পেন চাইত মেসি তাদের হয়ে খেলুক। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচরা বিভিন্নভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মেসির ইচ্ছা সব সময়ই ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি পরা।’
অথচ তখনও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও (এএফএ) জানত না, বার্সেলোনায় কী অসাধারণ এক প্রতিভা বেড়ে উঠছে। প্রথমদিকে খবর পেলেও সেটিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি তারা। কিন্তু মেসির খেলার ভিডিও হাতে আসতেই বদলে যায় পুরো চিত্র।
এরিয়েল সেনোসিয়াইন বলেন, ‘শুরুর দিকে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু মেসির ভিডিও দেখার পর সবাই বিস্মিত হয়ে যায়।’
তৎকালীন যুব দলের কোচ হুগো তোকাল্লিও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি, এত বড় প্রতিভা সত্যিই আছে। এমনকি জাতীয় দলের কোচ হোসে পেকারম্যানও তখনও মেসির নামই শোনেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগের সেই সময়ে স্পেনে বেড়ে ওঠা এই কিশোর সম্পর্কে আর্জেন্টিনায় খুব কম মানুষই জানতেন।
মজার বিষয় হলো, মেসিকে দলে ডাকতে গিয়েও ভুল করে বসেছিল এএফএ। কর্মকর্তাদের একজন ফোন করে মেসির বাবা হোর্হেকে জানিয়েছিলেন, তারা তার ছেলে ‘লিওনার্দোকে’ জাতীয় দলে ডাকতে চান। এএফএরকর্মকর্তারা ভেবেছিলেন ‘লিও’ নামটি ‘লিওনার্দো’র সংক্ষিপ্ত রূপ। তখন হোর্হে হেসে সংশোধন করে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলের নাম লিওনেল মেসি।’
তখনকার নিয়ম ছিল, কোনো খেলোয়াড় একবার একটি দেশের বয়সভিত্তিক দলের হয়ে খেললে পরে আর অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারতেন না। তাই আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। মেসির ১৭ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি করে কয়েকটি প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়, যাতে মেসিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মাঠে নামানো যায়।
মেসির অভিষেক হয় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সেই প্রীতি ম্যাচেই। ম্যাচটি কাভার করতে গিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন দৈনিক ওলের আলোকচিত্রী রাফায়েল কুইন্তেরোস। তবে সেদিন ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি কত বড় ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছেন!
কুইন্তেরোস স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, বেঞ্চে ‘মেসি’ নামে একজন ছেলে আছে, তার ছবি তুলতে হবে। আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মেসি কে?’ তখন সে নিজেই বলল, ‘আমিই মেসি।’ কয়েকটি ছবি তুলে শুভকামনা জানিয়ে চলে এসেছিলাম। তখন কল্পনাও করিনি, একদিন সে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হবে।’
স্পেন অবশ্য এত সহজে হাল ছাড়েনি। দেশটির সাবেক যুব দলের সমন্বয়ক জিনেস মেলেন্দেজ জানান, বার্সেলোনার কোচ আলেক্স গার্সিয়ার মাধ্যমে মেসির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকি তার সতীর্থ জেরার্ড পিকে ও সেস ফাব্রেগাসও তাকে স্পেনের হয়ে খেলার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন।
মেলেন্দেজ বলেন, ‘আমরা তাকে আমাদের হয়ে খেলতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছি। পিকে ও ফাব্রেগাসও তার সঙ্গে কথা বলেছিল। কিন্তু মেসি কখনোই রাজি হয়নি।’
শেষ পর্যন্ত মেসি নিজের সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন। এরপরের গল্প তো সবারই জানা। আর্জেন্টিনার জার্সিতে জিতেছেন বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফিনালিসিমা। সেই সঙ্গে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশটির সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে।
ফুটবলের গল্পগুলো বোধহয় এমনই হয়। যে স্পেন একদিন মেসিকে নিজেদের জার্সিতে দেখতে চেয়েছিল, সেই স্পেনের বিপক্ষেই এবার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামবেন তিনি। দুই দশক আগে শুরু হওয়া সেই গল্পের পরিণতি যেন এবার লেখা হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ// আরওয়া
