
সিলেট আলাপ ডেস্ক :“তোমার বাবাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, কেউ ভাবেনি উনি বেঁচে থাকবেন,” মা বারবার বলতেন এই কথাটা। বলতেন, সেই দিনটা তাদের জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দিন ছিল। আমার বাবা, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী,ছড়াকার, লেখক আবু সালেহ, ১৯৮০ সালের ২৩ মে-র সেই রক্তাক্ত বিকেলে ফিরেছিলেন স্প্লিন্টারে বিদ্ধ শরীরে।
সে দিন ছিল শুক্রবার। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে খন্দকার মোশতাক আহমদের ডেমোক্রেটিক লীগের জনসভায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। বিকেল ৪টা ১৯ মিনিট। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১৬ জন মানুষ মারা যান, আহত হন শতাধিক। বাবা গিয়েছিলেন দৈনিক “দেশ”-এর সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে অনুষ্ঠানটি কভার করতে। কিন্তু সেখানে সংবাদ সংগ্রহ নয়, বরং পেতে হয়েছিল মৃত্যুর মুখোমুখি যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা।
বোমার টুকরো বাবার শরীরে ঢুকেছিল ৬২টি। তার অনেকগুলোই আর বের করা যায়নি। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, অস্ত্রোপচার করলে প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি। বাবার চিকিৎসা চলে ঢাকায়, পরে লন্ডনের হারমি স্ট্রিট ও হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে। তবুও পরিপূর্ণ সুস্থতা আর আসেনি।
মা, কবি কাজী মাসুদা সালেহ, মাথার ওপর সেই আঘাত নিয়েই সংসার চালিয়েছেন। প্রতি বছর মে মাস এলেই মাকে ভেঙে পড়তে দেখতাম। তিনি বলতেন, “বোমার চেয়ে বড় ক্ষত রেখে গেছে রাষ্ট্রের নিরবতা।”
যারা হারিয়েছিলেন, যাদের ভুলে গেছি আমরা
সেদিন নিহত হন তরুণ সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান আশা, দৈনিক বাংলার রিপোর্টার। আহত হন অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক –
জহিরুল হক, দৈনিক বাংলা
মশির হোসেন হিরু, দৈনিক বাংলা
কামরুজ্জামান, চিত্র সাংবাদিক
শফিকুল কবির, ইত্তেফাক
রশিদ তালুকদার, ইত্তেফাক
আবদুল মান্নান, সংগ্রাম
মাহবুব, সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী এবং আরও অনেকে।
অনেকে আজ আর নেই, কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কিন্তু এই ইতিহাস কোথাও লেখা নেই। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নেই, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দলিলেও নেই।
বাবাকে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল
আমার বাবা ছিলেন সেই লাশের স্তূপে যাঁদের মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল। তিনি সবচেয়ে বেশিমাত্রায় আহত হয়েছিলেন। সাংবাদিক মাহবুব ও রশিদ তালুকদার তাঁকে টের পান, হৃদস্পন্দন আছে। তাঁরাই নিয়ে যান হাসপাতালে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পরদিন দেখতে আসেন, বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিছুদিন পরই তিনি নিহত হন।
এখনও বাবা প্রতিদিন একাধিক ওষুধ খান। শরীরে সেই পুরনো স্প্লিন্টারের ব্যথা আছে। অথচ আজও কেউ খোঁজ নেয় না। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ড বা হামলার কোনো তদন্ত প্রকাশ পায়নি। আমরা শুধু মনে রাখি মুক্ত গণমাধ্যম দিবস, কিন্তু মনে রাখি না তাদের, যাঁরা সত্য বলার দায়ে রক্ত দিয়েছেন।
আমরা কী চাই?
২৩মে কে জাতীয় সাংবাদিক নিরাপত্তা দিবস ঘোষণা করা হোক
মোস্তাফিজুর রহমান আশা কে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ সাংবাদিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক
সকল আহত সাংবাদিকের জন্য সম্মাননা ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত হোক
তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হোক এই ঘটনার
আমি শুধু চাই, আমার বাবার মতো মানুষরা আর অবহেলিত না হোন। তাঁদের জীবনের যন্ত্রণা যেন ইতিহাসের পাতায় জায়গা পায়, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে, সাংবাদিকতা মানে শুধু কলম নয়, অনেক সময় তা রক্ত আর জীবনও।
লেখক, আবু সালেহ পুত্র , কবি , গবেষক।
খবর পেতে সিলেটের আলাপ লাইক পেইজে ( LIKE ) দিতে ক্লিক করুন
সিলেট আলাপ// আজম চৌ:
